| বঙ্গাব্দ

২০২৬ ঈদযাত্রা: গাজীপুরে ১২ কিমি যানজট ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ | বাংলাদেশ প্রতিদিন

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 18-03-2026 ইং
  • 1386693 বার পঠিত
২০২৬ ঈদযাত্রা: গাজীপুরে ১২ কিমি যানজট ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ | বাংলাদেশ প্রতিদিন
ছবির ক্যাপশন: ২০২৬ ঈদযাত্রা

পোশাক শ্রমিকদের ঈদযাত্রা: গাজীপুর মহাসড়কে জনস্রোত ও শতাব্দীপ্রাচীন ভোগান্তির চালচিত্র

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

গাজীপুর ও কালিয়াকৈর: বাঙালির প্রধান উৎসব ঈদুল ফিতর ২০২৬-কে কেন্দ্র করে শিল্পনগরী গাজীপুর এখন জনারণ্যে পরিণত হয়েছে। বুধবার (১৮ মার্চ, ২০২৬) সকাল থেকেই ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে। বিশেষ করে পোশাক কারখানাগুলো ছুটি হওয়ার পর বিআরটি লেন এবং চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এই ভোগান্তি কেবল সড়কের সংকীর্ণতার ফল নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

বর্তমান চিত্র ও জনদুর্ভোগ সরেজমিনে দেখা গেছে, টঙ্গী থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার বিআরটি লেনে যানবাহন প্রায় স্থবির। অন্যদিকে, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোনাবাড়ী থেকে চন্দ্রা ত্রিমোড় পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে। শ্রমিকদের জন্য রিজার্ভ করা বাস এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে হাইওয়ে পুলিশ। শ্রমিক খোকন মিয়ার মতো হাজারো মানুষ ভোগান্তি মাথায় নিয়েই বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন। কালিয়াকৈর ও নাওজোর হাইওয়ে থানার তথ্যানুসারে, বুধবার দুপুরের পর প্রায় ৪০ শতাংশ কারখানা ছুটি হওয়ায় এই আকস্মিক চাপের সৃষ্টি হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯০০ থেকে ২০২৬ বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ঈদযাত্রার এই সংকটের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। ১৯০০ সালের শুরুর দিকে যখন এই অঞ্চলে রেলওয়ে ব্যবস্থার বিস্তার ঘটে, তখন থেকেই উৎসবের সময় মানুষের বড় ধরনের স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে যায়।

১. স্বাধীনতা-পরবর্তী পুনর্গঠন (১৯৭২-১৯৯০): স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী সামরিক শাসনামলে শিল্পায়নের সঠিক বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়ায় ঢাকার চারপাশে তৈরি পোশাক শিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটে। এর ফলে শুরু হয় বিশাল শ্রমশক্তির অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর।

২. পোশাক শিল্পের উত্থান ও নব্বইয়ের দশক: ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাতের বিপ্লব ঘটে। ফলে গাজীপুর ও আশপাশের এলাকায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠে। সেই সময় থেকেই ঈদের আগে চন্দ্রা ও চৌরাস্তা এলাকা যানজটের "হটস্পট" হিসেবে পরিচিতি পায়।

৩. ২০০৮-২০২৪: মেগা প্রজেক্ট ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: ২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যোগাযোগ খাতে আমূল পরিবর্তন আসে। জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা এবং বিআরটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। তবে উন্নয়ন প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতার কারণে ২০২৪ সাল পর্যন্ত উৎসবের সময় ভোগান্তি থেকে মুক্তি মেলেনি।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণ বিভিন্ন সময়ে দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্টরা এই যানজট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন:

  • ওবায়দুল কাদের (সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী): বিভিন্ন সময়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, "সড়ক অবকাঠামো উন্নত হলেও শৃঙ্খলার অভাবে যানজট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।" (২০১৮-২০২৪ এর বিভিন্ন বক্তব্য)।

  • আসাদুজ্জামান খান কামাল (সড়ক নিরাপত্তা সভা): তিনি বারবার গুরুত্বারোপ করেছেন যে, "মহাসড়কের ওপর অস্থায়ী বাসস্ট্যান্ড বা যত্রতত্র যাত্রী তোলা বন্ধ করতে হবে।"

  • সওগাতুল আলম (ওসি, নাওজোর হাইওয়ে থানা, ২০২৬): বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, "শ্রমিকদের জন্য ভাড়া করা কয়েক হাজার গাড়ি মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকায় যানজট আরও প্রকট হয়েছে।"

বিশ্লেষণ: ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ বর্তমানে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রভূত উন্নতি সত্ত্বেও "টাইম ম্যানেজমেন্ট" বা ছুটির সময়সূচীর অভাব প্রকট। গাজীপুরের ৫ হাজার কারখানার বিশাল শ্রমশক্তিকে একযোগে মুক্তি দিলে বিশ্বের যেকোনো উন্নত সড়কেই জটলা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। ১৯০০ সালের সীমিত যাতায়াত ব্যবস্থা থেকে ২০২৬ সালের স্মার্ট হাইওয়ে পর্যন্ত আমরা পৌঁছালেও, শিল্প মালিকদের সাথে প্রশাসনের সমন্বয় করে ধাপে ধাপে ছুটি প্রদান করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

উপসংহার বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী ৫ দশকেরও বেশি সময় পার হলেও ঈদযাত্রায় শ্রমিকদের এই সংগ্রাম থামেনি। তবে বিআরটি প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং মহাসড়ক ব্যবস্থাপনায় কঠোর শৃঙ্খলা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে ২০২৭ সালের ঈদযাত্রা আরও সহজতর হবে বলে আশা করা যায়।


সূত্র: যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন আর্কাইভ (১৯৭১-২০২৫), হাইওয়ে পুলিশ কন্ট্রোল রুম (নাওজোর স্টেশন) এবং স্থানীয় সংবাদদাতা।

বিশ্লেষণ প্রতিবেদন: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency